সূরার নামকরণ: পবিত্র কুরআনুল কারীমের মাত্র দুটি সূরা যে সূরা দুটির নামকরণ সূরায় উল্লিখিত শব্দ বা সূরায় বর্ণিত ঘটনা থেকে করা হয়নি। বরং নামকরণ করা হয়েছে সূরার মুখ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। একটি হলো সূরা ফাতিহা আর দ্বিতীয়টি হলো সূরা ইখলাস। অত্র সূরায় একজন সত্যিকার মা‘বূদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। الإخلَاص শব্দের অর্থ : একনিষ্ঠভাবে কোন কিছু করা। যেমন বলা হয় : أخلص لله عمله সে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্যই তার আমলকে সম্পাদন করেছে। সূরাতে যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার পরিচয় ও তাওহীদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তাই إخلَاص নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরাটির ফযীলত: সূরাটি আকারে ছোট হলেও ফযীলতের দিক দিয়ে অনেক বড়। আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের বললেন : তোমাদের কেউ কি রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে অপারগ হবে? এটা তাদের জন্য কষ্ট কর হয়ে গেল। তারা বলল : হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)! আমাদের কে এরূপ করতে সক্ষম হবে? তখন রাসূল (সাঃ) বললেন : (قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ) সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য। (সহীহ বুখারী হা. ৫০১৫) অর্থাৎ এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়লে যে নেকী হবে সেই নেকী এ সূরা পাঠ করলে পাওয়া যাবে। এভাবে এ সূরাটি তিনবার পড়লে সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার নেকী পাওয়া যাবে ইনশা আল্লাহ। কারণ পবিত্র কুরআনে মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তাওহীদ, আহকাম ও নসীহত। সূরা ইখলাসে তাওহীদ পূর্ণভাবে থাকার কারণে তা কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের মর্যাদা পেয়েছে। সূরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য, এ ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। (ইবনু কাসীর) আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নাবী (সাঃ) এক সাহাবীকে একদল বাহিনীর নেতা বানিয়ে প্রেরণ করলেন। সেই লোক বাহিনীর ইমামতি করে যখন সালাত আদায় করতেন তখন প্রত্যেক রাকাতেই সূরা ইখলাস দ্বারা কেরাত শেষ করতেন। সবাই যখন ফিরে আসল এবং নাবী (সাঃ)-কে বিষয়টি বলল তখন নাবী (সাঃ) বললেন : তাকে জিজ্ঞাসা কর কেন সে এরূপ করেছে? তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাবে বললেন : আমি এ সূরা পড়তে ভালবাসি। কেননা এতে দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি রয়েছে। নাবী (সাঃ) বললেন : তাকে বলে দাও আল্লাহ তা‘আলা তাকে ভালবাসেন। (সহীহ বুখারী হা. ৭৩৭৫) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আগমন করলেন এবং বললেন : আমি এ সূরাকে ভালবাসি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : এ সূরাকে ভালবাসার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (আহমাদ ৩/১৪১, সনদ সহীহ।) আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদাহ (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে মাসজিদে প্রবেশ করেন। এমন সময় এক ব্যক্তি সালাত আদায় করছিল আর দু‘আ করে বলছিল। اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللّٰهُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ أَنْتَ الأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ “হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট কামনা করছি ঐ বাক্যসমূহের মাধ্যমে যে, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমিই আল্লাহ। তুমি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই। তুমি একক, অমুখাপেক্ষী, যিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : ঐ সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! এ ব্যক্তি ইসমে আযমের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে চেয়েছে। এ নামে চাইলে তিনি দেন আর এ নামে ডাকলে তিনি ডাকে সাড়া দেন। (আবূ দাঊদ হা. ১৪৯৪, তিরমিযী হা. ৩৪৭৫, ইবনু মাযাহ হা. ৩৮৫৮, সনদ সহীহ) আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাঃ) প্রত্যেক রাতে যখন বিছানায় যেতেন তখন দু হাত একত্রিত করে ফুঁ দিতেন, অতঃপর সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করতেন। তারপর যথাসম্ভব দু হাত দিয়ে শরীর মাসাহ করতেন। তিনি প্রথমে মাথা, মুখমন্ডল ও শরীরের সম্মুখ ভাগ থেকে শুরু করতেন। (সহীহ বুখারী হা. ৫০১৭) শানে নুযূল: জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : এক গ্রাম্য ব্যক্তি নাবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল : তোমার রবের বংশ তালিকা বর্ণনা কর। তখন এ সূরা অবতীর্ণ হয়। (বায়হাকী ৭/১৪৬, হাসান।) উবাই বিন কাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, মুশরিকরা নাবী (সাঃ)-কে বলল : হে মুহাম্মাদ তোমার রবের বংশ তালিকা বর্ণনা কর। তখন এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। প্রত্যেক জিনিস যা জন্ম নেয় তা অবশ্যই মারা যাবে এবং যে জিনিস মারা যাবে পরবর্তী বংশধর তার ওয়ারিশ হবে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা মারা যাবেন না এবং তাঁর ওয়ারিশও কেউ হবে না।
পবিত্র কুরআনের ফজিলত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি সুরা ইখলাস। এ সুরাকে যে ভালোবাসে আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। ‘আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। একবার নবি (সা.) এক ব্যক্তিকে একটি সেনাদলের সেনাপতি করে পাঠালেন। সে তার সঙ্গীদের সালাত আদায় করাত এবং ‘কুল হুওয়াল্ল-হু আহাদ’ দিয়ে সালাত শেষ করত। তারা মদিনায় ফেরার পর নবি (সা.)-এর কাছে এ কথা উল্লেখ করেন।
তিনি (সা.) বললেন, তাকে জিজ্ঞেস কর কি কারণে সে তা করে। সে বলল, এর কারণ এতে আল্লাহর গুণাবলির উল্লেখ রয়েছে। আর আমি আল্লাহর গুণাবলি পড়তে ভালোবাসি। তার উত্তর শুনে নবি (সা.) বললেন, তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহতায়ালাও তাকে ভালোবাসেন। (সহিহ বোখারি, হাদিস-৭৩৭৫)।
সুরা ইখলাস ছোট একটি সুরা। সবার জন্য পড়া সহজ। কিন্তু সওয়াবের দিক থেকে তুলনাহীন। একবার পড়লে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তেলাওয়াতের সওয়াব লাভ হয়। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, নবিজি বলেছেন-তোমাদের প্রত্যেকেই কি প্রতি রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করতে পারে না? বিষয়টি সাহাবিদের কাছে কঠিন মনে হয়েছে।
তাই তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কে আছে, যে তা পারবে? নবি (সা.) বললেন, আমলটি সহজ কেননা, সুরা ইখলাসই কুরআন মজিদের এক তৃতীয়াংশ। (সহিহ বোখারি, হাদিস-৫০১৬)।
সূরা ইখলাসের বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা:
সূরা ইখলাস (আরবি: سورة الإخلاص)
অর্থ: খাঁটি বিশ্বাস বা একত্ববাদ
আয়াত ১:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
অনুবাদ: বলুন, তিনি আল্লাহ, একক।
আয়াত ২:
اللَّهُ الصَّمَدُ
অনুবাদ: আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (সকলের প্রয়োজন তিনি পূরণ করেন, কিন্তু তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই)।
আয়াত ৩:
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
অনুবাদ: তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি।
আয়াত ৪:
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
অনুবাদ: আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১১২ : ১ قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾
বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল-বায়ান
বল, তিনি আল্লাহ, এক অদ্বিতীয়, তাইসিরুল
বলঃ তিনিই আল্লাহ, একক/অদ্বিতীয়। মুজিবুর রহমান
Say, “He is Allah, [who is] One, Sahih International
১. বলুন(১), তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়(২),
(১) বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ তা’আলার বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, যার জওয়াবে এই সূরা নাযিল হয়। [তিরমিযী: ৩৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৩৪, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫৪০] কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, মুশরিকরা আরও প্রশ্ন করেছিল- আল্লাহ তা’আলা কিসের তৈরী, স্বর্ণরৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জওয়াবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে। [আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী: ৬/৩৭০, তাবরানী: মুজামুল আওসাত: ৩/৯৬, মুসনাদে আবি ইয়া’লা: ৬/১৮৩, নং ৩৪৬৮, আদ-দিনাওয়ারী: আল-মুজালাসা ও জাওয়াহিরুল ইলম, ৩/৫২৮, নং ১১৪৫] এখানে ‘বলুন’ শব্দটির মাধ্যমে প্রথমত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে। কারণ তাকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল। আপনার রব কে? তিনি কেমন? আবার তাকেই হুকুম দেয়া হয়েছিল, প্রশ্নের জবাবে আপনি একথা বলুন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিরোধানের পর এ সম্বোধনটি প্রত্যেক মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কথা বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল এখন সে কথা প্রত্যেক মুমিনকেই বলতে হবে।
(২) এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে, তিনি (যার সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করছে) আল্লাহ, একক অদ্বিতীয়। তাঁর কোন সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার কিছুই নেই। একত্ব তাঁরই মাঝে নিহিত। তাই তিনি পূর্ণতার অধিকারী, অদ্বিতীয়-এক। সুন্দর নামসমূহ, পূর্ণ শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে শুধুমাত্র তারই। [কুরতুবী, সা’দী]] আর أَحَد শব্দটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কেননা তিনিই গুণাবলী ও কার্যাবলীতে একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা। [ইবন কাহীর] মোটকথা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সত্তা ও গুণাবলীতে একক, তার কোন সমকক্ষ, শরীক নেই। এ সূরার শেষ আয়াত “আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই” দ্বারা তিনি এর ব্যাখ্যা করেছেন। মূলত সমগ্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত এমনকি সকল নবী-রাসূলদের রিসালাতের আগমন হয়েছিলো এ একত্ব ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার জন্যই। আল্লাহ ব্যতীত কোন হক মাবুদ বা ইলাহ নেই- সমগ্র সৃষ্টিজগতেই রয়েছে এর পরিচয়, আল্লাহর একত্বের পরিচয়। কুরআনে অগণিত আয়াতে এ কথাটির প্রমাণ ও যুক্তি রয়েছে। [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া
১। বল, তিনিই আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)।
–
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১২ : ২ اَللّٰهُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾
আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। আল-বায়ান
আল্লাহ কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নন, সবই তাঁর মুখাপেক্ষী, তাইসিরুল
আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। মুজিবুর রহমান
Allah, the Eternal Refuge. Sahih International
২. আল্লাহ হচ্ছেন সামাদ(১) (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী);
(১) صمد শব্দের অর্থ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের অনেক উক্তি আছে। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, ইকরামা বলেছেনঃ সামাদ হচ্ছেন এমন এক সত্তা, যার কাছে সবাই তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য পেশ করে থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবু ওয়ায়েল শাকীক ইবনে সালামাহ বলেছেন, তিনি এমন সরদার, নেতা, যার নেতৃত্ব পূর্ণতা লাভ করেছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যে সরদার তার নেতৃত্ব, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, ধৈর্য, সংযম, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা তথা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সমস্ত গুণাবলিতে সম্পূর্ণ পূর্ণতার অধিকারী তিনি সামাদ। যায়েদ ইবন আসলাম বলেন, এর অর্থ, নেতা। হাসান ও কাতাদা বলেন, এর অর্থ, যিনি তার সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে গেলেও অবশিষ্ট থাকবেন।
হাসান থেকে অন্য বর্ণনায়, তিনি ঐ সত্বা, যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক, যার কোন পতন নেই। অন্য বর্ণনায় ইকরিমা বলেন, যার থেকে কোন কিছু বের হয়নি এবং যিনি খাবার গ্রহণ করেন না। রবী ইবন আনাস বলেন, যিনি জন্ম গ্ৰহণ করেননি এবং জন্ম দেননি। সম্ভবত তিনি পরবর্তী আয়াতকে এ আয়াতের তাফসীর হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, মুজাহিদ, ইবন বুরাইদা, আতা, দাহহাক সহ আরো অনেকে এর অর্থ বলেছেন, যার কোন উদর নেই। শা’বী বলেন, এর অর্থ যিনি খাবার খান না। এবং পানীয় গ্রহণ করেন না। আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদাহ বলেন, এর অর্থ, যিনি এমন আলো যা চকচক করে। এ বর্ণনাগুলো ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী, ইবন আবী হাতেম, বাইহাকী, তাবারানী প্রমূখগণ সনদসহ বর্ণনা করেছেন। [দেখুন: তাবারী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
বস্তুত: উপরে বর্ণিত অর্থগুলোর সবই নির্ভুল। এর মানে হচ্ছে, আসল ও প্রকৃত সামাদ হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। সৃষ্টি যদি কোন দিক দিয়ে সামাদ হয়ে থাকে তাহলে অন্য দিক দিয়ে তা সামাদ নয় কারণ তা অবিনশ্বর নয় একদিন তার বিনাশ হবে। কোন কোন সৃষ্টি তার মুখাপেক্ষী হলেও সে নিজেও আবার কারো মুখাপেক্ষী। তার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরংকুশ নয়। কারো তুলনায় সে শ্রেষ্ঠতম হলেও তার তুলনায় আবার অন্য কেউ আছে শ্রেষ্ঠতম। কিছু সৃষ্টির কিছু প্রয়োজন সে পূর্ণ করতে পারে। কিন্তু সবার সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই। বিপরীতপক্ষে আল্লাহর সামাদ হবার গুণ অর্থাৎ তাঁর মুখাপেক্ষীহীনতার গুণ সবদিক দিয়েই পরিপূর্ণ। সারা দুনিয়া তাঁর মুখাপেক্ষী তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিস নিজের অস্তিত্ব, স্থায়ীত্ব এবং প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য সচেতন ও অবচেতনভাবে তাঁরই শরণাপন্ন হয়। তিনিই তাদের সবার প্রয়োজন পূর্ণ করেন।
তিনি অমর, অজয়, অক্ষয়। তিনি রিযিক দেন, নেন না। সমগ্ৰ বিশ্ব জাহানের ওপর তাঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই তিনি “আস-সামাদ।” অর্থাৎ তিনিই একমাত্র সত্তা যিনি অমুখাপেক্ষিতার গুণাবলীর সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত। আবার যেহেতু তিনি “আস-সামাদ” তাই তার একাকী ও স্বজনবিহীন হওয়া অপরিহার্য। কারণ এ ধরনের সত্তা একজনই হতে পারেন, যিনি কারো কাছে নিজের অভাব পূরণের জন্য হাত পাতেন না, বরং সবাই নিজেদের অভাব পূরণের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী হয়। দুই বা তার চেয়ে বেশী সত্তা সবার প্রতি অমুখাপেক্ষী ও অনির্ভরশীল এবং সবার প্রয়োজন পূরণকারী হতে পারে না। তাছাড়া তাঁর “আস-সামাদ” হবার কারণে তাঁর একক মাবুদ হবার ব্যাপারটিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ মানুষ যার মুখাপেক্ষী হয় তারই ইবাদাত করে। আবার তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, “আস-সামাদ” হবার কারণে এটাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ, যে প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা ও সামর্থই রাখে না, কোন সচেতন ব্যক্তি তার ইবাদাত করতে পারে না। এভাবে আমরা উপরোক্ত অর্থগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারি।
তাফসীরে জাকারিয়া
২। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। [1]
[1] অর্থাৎ, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১২ : ৩ لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ﴿۳﴾
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আল-বায়ান
তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। তাইসিরুল
তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন, মুজিবুর রহমান
He neither begets nor is born, Sahih International
৩. তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি(১),
(১) যারা আল্লাহর বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, এটা তাদের জওয়াব। সন্তান প্ৰজনন সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য- স্রষ্টার নয়। অতএব, তিনি কারও সন্তান নন এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, “আদম সন্তান আমার উপর মিথ্যারোপ করে অথচ এটা তার জন্য উচিত নয়। আর আমাকে গালি দেয়, এটাও তার জন্য উচিত নয়। তার মিথ্যারোপ হচ্ছে, সে বলে আমাকে যেভাবে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন সেভাবে তিনি কখনও আমাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন না। অথচ দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রথম সৃষ্টির চেয়ে কোনভাবেই কঠিন নয়। আর আমাকে গালি দেয়ার ব্যাপারটি হলো, সে বলে আল্লাহ সন্তান গ্ৰহণ করেছেন। অথচ আমি একক, সামাদ, জন্মগ্রহণ করিনি এবং কাউকে জন্মও দেইনি। আর কেউই আমার সমকক্ষ নেই।” [বুখারী: ৪৯৭৪]
তাফসীরে জাকারিয়া
৩। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন। [1]
[1] অর্থাৎ, জনক নন এবং জাতকও নন। তাঁর থেকে কিছু উদ্ভূত নয় এবং তিনিও কিছু থেকে উদ্ভূত নন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১২ : ৪ وَ لَمۡ یَكُنۡ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ ﴿۴﴾
আর তাঁর কোন সমকক্ষও নেই। আল-বায়ান
তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়। তাইসিরুল
এবং তাঁর সমতুল্য কেহই নেই। মুজিবুর রহমান
Nor is there to Him any equivalent.” Sahih International
৪. এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।(১)
(১) মূলে বলা হয়েছে ‘কুফু’। এর মানে হচ্ছে, নজীর, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমতুল্য। আয়াতের মানে হচ্ছে, সারা বিশ্ব-জাহানে আল্লাহর সমকক্ষ অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন কিংবা নিজের গুণাবলী, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে এমন কেউ কোন দিন ছিল না এবং কোন দিন হতেও পারবে না। এবং আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাথে সামঞ্জস্য রাখে না। এক হাদীসে এসেছে, বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন এক লোক সালাত আদায় করছে এবং বলছে, اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ بِأَنِّى أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ الَّذِى لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ الأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِى لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُواً أَحَدٌ এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এ লোকটি আল্লাহকে তাঁর এমন মহান নামে ডাকল যার অসীলায় চাইলে তিনি প্ৰদান করেন। আর যার দ্বারা দোআ করলে তিনি কবুল করেন” [আবু দাউদ: ১৪৯৩, তিরমিযী: ৩৪৭৫, ইবনে মাজহ: ৩৮৫৭, মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৫০]
মুশরিকরা প্রতি যুগে মাবুদদের ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করে এসেছে যে, মানুষের মতো তাদেরও একটি জাতি বা শ্রেণী আছে। তার সদস্য সংখ্যাও অনেক। তাদের মধ্যে বিয়ে-শাদী এবং বংশ বিস্তারের কাজও চলে। তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেও এ জাহেলী ধারণা মুক্ত রাখেনি। তাঁর জন্য সন্তান সন্ততিও ঠিক করে নিয়েছে। তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা গণ্য করতো। যদিও তাদের কেউ কাউকে আল্লাহর পিতা গণ্য করার সাহস করেনি। কিন্তু তারা তাদের কোন কোন ব্যক্তি বা নবীকে আল্লাহর সন্তান মনে করতে দ্বিধা করেনি। এ সবের উত্তরেই এ সূরায় বলা হয়েছে, তিনি কাউকে জন্ম দেননি। আর তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। যদিও মহান আল্লাহকে “আহাদ” ও “আস-সামাদ” বললে এসব উদ্ভট ধারণা-কল্পনার মুলে কুঠারাঘাত করা হয়, তবুও এরপর “না তাঁর কোন সন্তান আছে, না তিনি কারো সন্তান” একথা বলায় এ ব্যাপারে আর কোন প্রকার সংশয় সন্দেহের অবকাশই থাকে না।
তারপর যেহেতু আল্লাহর মহান সত্তা সম্পর্কে এ ধরনের ধারণাকল্পনা শিরকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত, তাই মহান আল্লাহ শুধুমাত্র সূরা ইখলাসেই এগুলোর দ্ব্যর্থহীন ও চূড়ান্ত প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। এভাবে লোকেরা সত্যকে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নীচের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে, “আল্লাহই হচ্ছেন একমাত্র ইলাহ। কেউ তাঁর পুত্র হবে, এ অবস্থা থেকে তিনি মুক্ত-পাক-পবিত্র। যা কিছু, আকাশসমূহের মধ্যে এবং যা কিছু যমীনের মধ্যে আছে, সবই তার মালিকানাধীন।” [সূরা আন-নিসা: ১৭১] “জেনে রাখো, এরা যে বলছে আল্লাহর সন্তান আছে, এটা এদের নিজেদের মনগড়া কথা। আসলে এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা।” [সূরা আস-সাফফাত: ১৫১–১৫২] “তারা আল্লাহ ও জিনদের মধ্যে বংশীয় সম্পর্কে তৈরি করে নিয়েছে অথচ জিনেরা ভালো করেই জানে এরা (অপরাধী হিসেবে) উপস্থাপিত হবে।” [সূরা আস-সাফফাত: ১৫৮] “লোকেরা তার বান্দাদের মধ্য থেকে কাউকে তার অংশ বনিয়ে ফেলেছে। আসলে মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।” [সূরা আয-যুখরুফ: ১৫]
“আর লোকেরা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়েছে। অথচ তিনি তাদের স্রষ্টা। আর তারা না জেনে বুঝে তার জন্য পুত্ৰ-কণ্যা বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তারা যে সমস্ত কথা বলে তা থেকে তিনি মুক্ত ও পবিত্র এবং তার ঊর্ধ্বে তিনি অবস্থান করছেন। তিনি তো আকাশসমূহ ও পৃথিবীর নির্মাতা। তাঁর পুত্র কেমন করে হতে পারে যখন তাঁর কোন সঙ্গিনী নেই? তিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আল-আন’আম: ১০০–১০১] “আর তারা বললো, দয়াময় আল্লাহ কাউকে পুত্ৰ বানিয়েছেন। তিনি পাক-পবিত্র। বরং (যাদেরকে এরা তাঁর সন্তান বলছে) তারা এমন সব বান্দা যাদেরকে মৰ্যদা দান করা হয়েছে।” [সূরা আল-আম্বিয়া: ২৬]
“লোকেরা বলে দিয়েছে, আল্লাহ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন আল্লাহ পাক-পবিত্ৰ! তিনি তো অমুখাপেক্ষী। আকাশসমূহে ও যমীনে যা কিছু আছে সবই তার মালিকানাধীন। এ বক্তব্যের সপক্ষে তোমাদের প্রমাণ কি? তোমরা কি আল্লাহর সম্পর্কে এমন সব কথা বলছো, যা তোমরা জানো না?” [সূরা ইউনুস: ৬৮] “আর হে নবী! বলে দিন। সেই আল্লাহর জন্য সব প্রশংসা যিনি না কাউকে পুত্র বানিয়েছেন না বাদশাহীতে কেউ তাঁর শরীক আর না তিনি অক্ষম, যার ফলে কেউ হবে তাঁর পৃষ্ঠপোষক।” [সূরা আল-ইসরা: ১১১] যারা আল্লাহর জন্য সন্তান গ্রহণ করার কথা বলে, এ আয়াতগুলোতে সর্বতোভাবে তাদের এহেন আকীদা-বিশ্বাসের প্রতিবাদ করা হয়েছে। এ আয়াতগুলো এবং এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য যে সমস্ত আয়াত কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়, সেগুলো সূরা ইখলাসের অতি চমৎকার ব্যাখ্যা।
তাফসীরে জাকারিয়া
৪। এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। [1]
[1] কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়; না তাঁর সত্তায়, না তাঁর গুণাবলীতে এবং না তাঁর কর্মাবলীতে। ‘‘তাঁর মত কোন কিছুই নেই।’’ (সূরা শুরা ১১ নং আয়াত)
হাদীসে ক্বুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘মানুষ আমাকে গালি দেয়; অর্থাৎ, আমার সন্তান আছে বলে। অথচ আমি একক ও অমুখাপেক্ষী। আমি কাউকে না জন্ম দিয়েছি; না কারো হতে জন্ম নিয়েছি। আর না কেউ আমার সমতুল্য আছে। (সহীহ বুখারী সূরা ইখলাসের তফসীর অধ্যায়।)
এই সূরা ঐ সকল লোকদের বিশ্বাস খন্ডন করে, যারা একাধিক উপাস্যে বিশ্বাসী, যারা মনে করে আল্লাহর সন্তান আছে, যারা তাঁর সাথে অন্যকে শরীক স্থাপন করে এবং যারা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
