بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
(১) ধ্বংস হৌক আবু লাহাবের দু’হাত এবং ধ্বংস হৌক সে নিজে।
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
(২) তার কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা কিছু সে উপার্জন করেছে।
مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ
(৩) সত্বর সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে।
سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ
(৪) এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহনকারিণী।
وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ
(৫) তার গলদেশে খর্জুরপত্রের পাকানো রশি।
فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ
শানে নুযূল :
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর আয়াত নাযিল হ’ল, وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ ‘আর তুমি তোমার নিকটতম আত্মীয়-পরিজনকে সতর্ক কর’ (শো‘আরা ২৬/২১৪), তখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী একদিন সকালে ছাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সকলের উদ্দেশ্যে বিপদসংকেতমূলক ভাষায় ডাক দিয়ে বলেন, يا صَباحاه (প্রত্যুষে সকলে সমবেত হও!)। এভাবে রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাকতে থাকলেন। অতঃপর সবাই হাযির হ’লে তিনি বলেন, أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ الْعَدُوَّ يُصَبِّحُكُمْ أَوْ يُمَسِّيكُمْ أَمَا كُنْتُمْ تُصَدِّقُونِى؟ قَالُوا بَلَى- আমি যদি বলি এই পাহাড়ের অপর পার্শ্বে একদল শত্রুসেনা তোমাদের উপরে সকালে বা সন্ধ্যায় হামলার জন্য অপেক্ষা করছে, তাহ’লে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে না? সকলে সমস্বরে বলে উঠলো, অবশ্যই করব। কেননা, مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلاَّ صِدْقًا ‘আমরা এযাবত তোমার কাছ থেকে সত্য ব্যতীত কিছুই পাইনি’। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, فَإِنِّىْ نَذِيْرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَىْ عَذَابٍ شَدِيْدٍ ‘আমি ক্বিয়ামতের কঠিন আযাবের প্রাক্কালে তোমাদের নিকটে সতর্ককারী রূপে আগমন করেছি’। অতঃপর তিনি আবেগময় কণ্ঠে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ أَنْقِذُوْا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِىْ كَعْبِ بْنِ لُؤَىٍّ أَنْقِذُوْا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِىْ عَبْدِ مَنَافٍ أَنْقِذُوْا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِىْ هَاشِمٍ أَنْقِذُوْا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِىْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَنْقِذُوْا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا عَبَّاسُ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لاَ أُغْنِى عَنْكَ مِنَ اللهِ شَيْئًا، يَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ أَنْقِذِىْ نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ، فَإِنِّىْ لاَ أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللهِ شَيْئاً غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِماً سَأَبُلُّهَا بِبَلاَلِهَا –
আরও দেখুন
Family
Islam
Places of Worship
‘হে কুরায়েশগণ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু কা‘ব বিন লুআই! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু আবদে মানাফ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু হাশেম! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু আব্দিল মুত্ত্বালিব! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে আববাস বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব! আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমার কোনই কাজে আসব না। হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা! তুমি নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! কেননা আমি তোমাদের কাউকে আল্লাহর পাকড়াও হ’তে রক্ষা করতে পারব না’। তবে তোমাদের সঙ্গে আত্মীয়তার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা আমি (দুনিয়াতে) সদ্ব্যবহার দ্বারা সিক্ত করব’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, يَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَلِيْنِىْ مَا شِئْتِ مِنْ مَالِىْ وَلاَ أُغْنِى عَنْكِ مِنَ اللهِ شَيْئًا ‘হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা! তুমি আমার মাল-সম্পদ থেকে যা খুশী নাও। কিন্তু আল্লাহর পাকড়াও হ’তে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না’।[1] অন্য বর্ণনায় এসেছে, إلا ان تقولوا لآ اله الا الله ‘তবে যদি তোমরা বল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই)।[2]
রাসূল (ছাঃ)-এর এই মর্মস্পর্শী আবেদন গর্বোদ্ধত চাচা আবু লাহাবের অন্তরে দাগ কাটেনি। তিনি চিৎকার দিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর মুখের উপর বলে দিলেন تَبًّا لَكَ سَائِرَ الْيَوْمِ ، أَلِهَذَا جَمَعْتَنَا؟ ‘সকল দিনে তোমার উপর ধ্বংস আপতিত হৌক! এজন্য তুমি আমাদের জমা করেছ’? বলেই তিনি উঠে যান। অতঃপর অত্র সূরাটি নাযিল হয়।[3] কথিত আছে যে, এই সময় আবু লাহাব রাসূল (ছাঃ)-কে পাথর মারতে উদ্যত হন। কিন্তু আল্লাহ তাকে প্রতিরোধ করেন’ (কুরতুবী; আর-রাহীক্ব ৮৬ পৃ:)।
আবু লাহাব কথাটি তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন। কেননা আখেরাতে জবাবদিহিতার কথা তাদের আগেই জানা ছিল। কিন্তু এটি তাদের কাছে অতীব তুচ্ছ বিষয় ছিল। দুনিয়া তাদেরকে গ্রাস করেছিল ও আখেরাত থেকে বেপরওয়া করেছিল।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১১১ : ১ تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَهَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾
ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। আল-বায়ান
আবূ লাহাবের হাত দু‘টো ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সে নিজে, তাইসিরুল
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। মুজিবুর রহমান
May the hands of Abu Lahab be ruined, and ruined is he. Sahih International
১. ধ্বংস হোক আবু লাহাবের(১) দুহাত(২) এবং ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
(১) আবু লাহাবের আসল নাম ছিল আবদুল উযযা। সে ছিল আবদুল মুত্তালিবের অন্যতম সন্তান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা। গৌরবর্ণের কারণে তার ডাক নাম হয়ে যায় আবু লাহাব। কারণ, ‘লাহাব’ বলা হয় আগুণের লেলিহান শিখাকে। লেলিহান শিখার রং হচ্ছে গৌরবর্ণ। সে অনুসারে আবু লাহাব অর্থ, গৌরবর্ণবিশিষ্ট। পবিত্র কুরআন তার আসল নাম বর্জন করেছে। কারণ, সেটা মুশরিকসুলভ। এছাড়া আবু লাহাব ডাক নামের মধ্যে জাহান্নামের সাথে বেশ মিলও রয়েছে। কারণ, জাহান্নামের অগ্নির লেলিহান শিখা তাকে পাকড়াও করবে। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কট্টর শত্রু ও ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল।
সে নানাভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কষ্ট দেয়ার প্রয়াস পেত। তিনি যখন মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দিতেন, তখন সে সাথে সাথে গিয়ে তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করত। রবী’আ ইবনে আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাহিলিয়াতের (অন্ধকার) যুগে যুল-মাজায বাজারে দেখলাম, তিনি বলছিলেন, “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, সফলকাম হবে”। আর মানুষ তার চতুষ্পার্শে ভীড় জমাচ্ছিল। তার পিছনে এক গৌরবর্ণ টেরা চোখবিশিষ্ট সুন্দর চেহারার লোক বলছিল, এ লোকটি ধর্মত্যাগী, মিথ্যাবাদী। এ লোকটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে পিছনে যেখানে তিনি যেতেন সেখানেই যেত। তারপর আমি লোকদেরকে এ লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। লোকেরা বলল, এটি তারই চাচা আবু লাহাব।” [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৪১]
অন্য বর্ণনায়, রবী’আ ইবনে আব্বাদ বলেন, আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি কিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে পেশ করে বলছিলেন, “হে অমুক বংশ! আমি তোমাদের সবার নিকট আল্লাহর রাসূল। তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দিচ্ছি। আর আমি এটাও চাই যেন তোমরা সত্য বলে বিশ্বাস কর এবং আমার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ কর, যাতে করে আমি আমার আল্লাহর কাছ থেকে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।” যখনই তিনি এ কথাগুলো বলে শেষ করতেন তখনই তার পিছন থেকে এক লোক বলত: হে অমুক বংশ! সে তোমাদেরকে লাত ও উযযা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়— সে নতুন কথা চালু করেছে, সে ভ্ৰষ্টতা নিয়ে এসেছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শোনবে না এবং তার অনুসরণ করবে না। তখন আমি আমার পিতাকে বললাম, এ লোকটি কে? তিনি বললেন, ঐ লোকটির চাচা আবু লাহাব। [মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪৯২] [ফাতহুল কাদীর, ইবন কাসীর]
(২) يد শব্দের অর্থ হাত। মানুষের সব কাজে হাতের প্রভাবই বেশি, তাই কোন ব্যক্তির সত্তাকে হাত বলেই ব্যক্ত করে দেয়া হয়; যেমন কুরআনের অন্যত্র (بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ) বলা হয়েছে। (تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ) এর অর্থ কোন তাফসীরকার করেছেন, “ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত” এবং وَتَبَّ শব্দের মানে করেছেন, “সে ধ্বংস হয়ে যাক” অথবা “সে ধ্বংস হয়ে গেছে।” কোন কোন তাফসীরকার বলেন, এটা আবু লাহাবের প্রতি একটি ভবিষ্যদ্বাণী। এখানে ভবিষ্যতে যে ঘটনাটি ঘটবে তাকে অতীত কালের অর্থ প্রকাশক শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মানে, তার হওয়াটা যেন এত বেশী নিশ্চিত যেমন তা হয়ে গেছে। আর যা এ সূরায় কয়েক বছর আগে বর্ণনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাই সত্য হলো। এখানে হাত ভেঙে যাওয়ার মানে শুধু শরীরের একটি অংগ যে হাত সেটি ভেঙে যাওয়াই নয়। বরং কোন ব্যক্তি যে উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাতে পুরোপুরি ও চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়াই এখানে বুঝানো হয়েছে। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
আর আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথার্থই নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। কিন্তু এ সূরাটি নাযিল হবার মাত্র সাত আট বছর পরেই বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ বড় বড় সরদার নিহত হয়। তারা সবাই ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল। এ পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌছার পর সে যত বেশী মর্মাহত হয় যে, এরপর সে সাত দিনের বেশী জীবিত থাকতে পারেনি। যে দ্বীনের অগ্রগতির পথ রোধ করার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তার সন্তানদের সেই দ্বীন গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তার আরো বেশী ও পূর্ণ পরাজয় সম্পন্ন হয়। সর্বপ্রথম তার মেয়ে দাররা হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা ও মু’আত্তাব রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে হাযির হয়ে ইসলাম গ্ৰহণ করেন এবং তার হাতে বাই’আত করেন। [রুহুল মা’আনী]
তাফসীরে জাকারিয়া
১। ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। [1]
[1] يَدَا শব্দটি يَدٌ এর দ্বিবচন। অর্থ হল দুই হাত। এ থেকে উদ্দেশ্য হল তার সত্তা বা দেহ। এই আংশিক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করে সমষ্টিগত অর্থ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সে নিজে ধ্বংস হয়ে যাক। এই বদ্দুআটি সেই বদ্দুআর জওয়াবে বলা হয়েছে, যা আবু লাহাব মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি রাগ ও শত্রুতাবশে করেছিল।
تَبَّ শব্দের অর্থ হল ধ্বংস ও বরবাদ হয়েছে। অর্থাৎ, সে ধ্বংস হয়েছে। (অতীত কালকে দু’আর অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।) অথবা এটা হল খবর। বদ্দুআর সাথে সাথেই মহান আল্লাহ তার ধ্বংস ও বরবাদ হওয়ার খবর ঘোষণা করেছেন। সুতরাং বদর যুদ্ধের কয়েক দিন পরেই সে এক প্রকার চর্মরোগে আক্রান্ত হল; যে রোগে দেহে প্লেগের মত গুটলি প্রকাশ পায়। এই রোগই তাকে মৃত্যুর গ্রাস বানালো। তিন দিন পর্যন্ত তার লাশ এমনিই পড়ে ছিল। পরিশেষে তা খুবই দুর্গন্ধময় হয়ে উঠল। অতঃপর ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এবং মান-সম্মানের ভয়ে তার ছেলেরা তাকে দূর থেকে পাথর ও মাটি ঢেলে দেহটাকে দাফন করে দিল। (আইসারুত তাফাসীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১১ : ২ مَاۤ اَغۡنٰی عَنۡهُ مَالُهٗ وَ مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾
তার ধন-সম্পদ এবং যা সে অর্জন করেছে তা তার কাজে আসবে না। আল-বায়ান
তার ধন-সম্পদ আর সে যা অর্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসল না, তাইসিরুল
ওর ধন সম্পদ ও ওর উপার্জন ওর কোন উপকারে আসেনি। মুজিবুর রহমান
His wealth will not avail him or that which he gained. Sahih International
২. তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন(১) তার কোন কাজে আসেনি।
(১) كَسَبَ এর অর্থ ধন-সম্পদ দ্বারা অর্জিত মুনাফা ইত্যাদি। এর অর্থ সন্তান-সন্ততিও হতে পারে। কেননা, সন্তান-সন্ততিকেও মানুষের উপার্জন বলা হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম বলেন, “মানুষ যা খায়, তন্মধ্যে তার উপার্জিত বস্তুই সর্বাধিক হালাল ও পবিত্র, আর তার সন্তান সন্ততিও তার উপার্জিত বস্তুর মধ্যে দাখিল।” [নাসায়ী: ৪৪৪৯; আবু দাউদ: ৩৫২৮] অর্থাৎ সন্তানের উপার্জন খাওয়াও নিজের উপার্জন খাওয়ারই নামান্তর। এ কারণে কয়েকজন তাফসীরবিদ এস্থলে كَسَبَ এর অর্থ করেছেন সন্তান-সন্ততি। [কুরতুবী, ইবন কাসীর] আল্লাহ তা’আলা আবু লাহাবকে যেমন দিয়েছিলেন অগাধ ধন-সম্পদ, তেমনি দিয়েছিলেন অনেক সন্তান-সন্ততি। অকৃতজ্ঞতার কারণে এ দুটি বস্তুই তার গর্ব, অহমিকা ও শাস্তির কারণ হয়ে যায়।
তাফসীরে জাকারিয়া
২। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন উপকারে আসবে না।[1]
[1] উপার্জনে তার নেতৃত্ব, পদমর্যাদা এবং তার সন্তানরাও শামিল। অর্থাৎ, যখন আল্লাহর পাকড়াও এল, তখন কোন জিনিস বা কেউ তার কাজে এল না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১১ : ৩ سَیَصۡلٰی نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾
অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে। আল-বায়ান
অচিরে সে প্রবেশ করবে লেলিহান শিখাযুক্ত আগুনে, তাইসিরুল
অচিরেই সে শিখা বিশিষ্ট জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে, মুজিবুর রহমান
He will [enter to] burn in a Fire of [blazing] flame Sahih International
৩. অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে(১),
(১) অর্থাৎ কেয়ামতে অথবা মৃত্যুর পর কবরেই সে এক লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবে। তার নামের সাথে মিল রেখে অগ্নির বিশেষণ (ذَاتَ لَهَبٍ) বলার মধ্যে বিশেষ অলংকার রয়েছে। [আত তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
৩। অচিরেই সে শিখাবিশিষ্ট (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করবে।
–
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১১ : ৪ وَّ امۡرَاَتُهٗ ؕ حَمَّالَۃَ الۡحَطَبِ ۚ﴿۴﴾
আর তার স্ত্রী লাকড়ি বহনকারী, আল-বায়ান
আর তার স্ত্রীও- যে কাঠবহনকারিণী (যে কাঁটার সাহায্যে নবী-কে কষ্ট দিত এবং একজনের কথা অন্যজনকে ব’লে পারস্পরিক বিবাদের আগুন জ্বালাত)। তাইসিরুল
এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে। মুজিবুর রহমান
And his wife [as well] – the carrier of firewood. Sahih International
৪. আর তার স্ত্রীও(১)- যে ইন্ধন বহন করে(২),
(১) আবু লাহাবের স্ত্রীর নাম ছিল “আরওয়া”। সে ছিল আবু সুফিয়ানের বোন ও হরব ইবনে উমাইয়্যার কন্যা। তাকে “উম্মে জামীল” বলা হত। আবু লাহাবের ন্যায় তার স্ত্রীও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিদ্বেষী ছিল। সে এ ব্যাপারে তার স্বামীকে সাহায্য করত। আয়াতে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, এই হতভাগিনীও তার স্বামীর সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এক বর্ণনায় এসেছে, এ মহিলা যখন শুনতে পেল যে, আল্লাহ তা’আলা তার ও তার স্বামীর ব্যাপারে আয়াত নাযিল করে অপমানিত করেছেন সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বসা ছিলেন।
তার সাথে ছিলেন আবু বকর। তখন আবু বকর বললেন, আপনি যদি একটু সরে যেতেন তা হলে ভাল হতো যাতে করে এ মহিলা আপনাকে কোন কষ্ট না দিতে পারে। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ও তার মাঝে বাধার সৃষ্টি করা হবে। ইত্যবসরে মহিলা এসে আবু বকরকে জিজ্ঞেস করল, আবু বকর! তোমার সাথী আমাদের বদনামী করে কবিতা বলেছে? তিনি জবাবে বললেন, এ ঘরের (কাবার) রবের শপথ, তিনি কোন কবিতা বলেননি এবং তার মুখ দিয়ে তা বেরও হয়নি। তখন মহিলা বলল, তুমি সত্য বলেছ। তারপর মহিলা চলে গেলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, সে কি আপনাকে দেখেনি? রাসূল বললেন, মহিলা ফিরে যাওয়া পর্যন্ত একজন ফেরেশতা আমাকে তার থেকে আড়াল করে রাখছিল। [মুসনাদে আবি ইয়া’লা: ২৫, ২৩৫৮, মুসনাদে বাযযার: ২৯৪] [ইবন কাসীর]
(২) এখানে আবু জাহলের স্ত্রী উম্মে জামীলের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে (حَمَّالَةَ الْحَطَبِ) বলা হয়েছে। এর শাব্দিক অর্থ শুষ্ককাঠ বহনকারিণী। আরবের বাকপদ্ধতিতে পশ্চাতে নিন্দাকারীকে ‘খড়ি-বাহক’ বলা হত। শুষ্ককাঠ একত্রিত করে যেমন কেউ অগ্নি সংযোগের ব্যবস্থা করে, পরোক্ষে নিন্দাকার্যটিও তেমনি। এর মাধ্যমে সে ব্যক্তিবর্গ ও পরিবারের মধ্যে আগুন জ্বলিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আবু লাহাব পত্নী পরোক্ষ নিন্দাকার্যের সাথেও জড়িত ছিল। অধিকাংশ তাফসীরবিদ এখানে এ তাফসীরই করেছেন। অপরপক্ষে কোন কোন তাফসীরবিদগণ একে আক্ষরিক অর্থেই রেখেছেন এবং কারণ এই বর্ণনা করেছেন যে, এই নারী বন থেকে কন্টকযুক্ত লাকড়ি চয়ন করে আনত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়ার জন্যে তার পথে বিছিয়ে রাখত।
তার এই নীচ ও হীন কাণ্ডকে কুরআন (حَمَّالَةَ الْحَطَبِ) বলে ব্যক্ত করেছে। ইমাম তাবারী এ উক্তিটি গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, তার এই অবস্থাটি হবে জাহান্নামে। সে জাহান্নামে লাকড়ি এনে জাহান্নামে তার স্বামীর উপর নিক্ষেপ করবে, যাতে অগ্নি আরও প্ৰজ্বলিত হয়ে উঠে, যেমন দুনিয়াতেও সে স্বামীকে সাহায্য করে তার কুফার ও জুলুম বাড়িয়ে দিত। কোন কোন মুফাসসির বলেন, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দরিদ্র বলে উপহাস করত। পরিণামে আল্লাহ এ মহিলাকে লাকড়ি আহরণকারী বলে অপমানজনক উপাধী দিয়ে উপহাস করেছেন। আবার সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, আয়াতের অর্থ “গোনাহের বোঝা বহনকারিনী”। [কুরতুবী, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
৪। এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহনকারিণী। [1]
[1] অর্থাৎ, জাহান্নামে সে স্বামীর আগুনে কাঠ এনে এনে নিক্ষেপ করতে থাকবে; যাতে আগুন বেশী বৃদ্ধি পাবে। আর তা হবে আল্লাহর তরফ হতে। অর্থাৎ, যেমন সে দুনিয়াতে নিজ স্বামীর কুফর ও ঔদ্ধত্যে মদদ যোগাত, তেমনি আখেরাতেও তার আযাব বৃদ্ধিতে মদদ যোগাতে থাকবে। (ইবনে কাসীর) কিছু সংখ্যক উলামা বলেন, এই মেয়েটি কাঁটার ঝাড় এনে মহানবী (সাঃ)-এর চলার পথে রেখে দিত। (যাতে তিনি কাঁটাবিদ্ধ হয়ে কষ্ট পান।) আবার কোন কোন আলেম বলেন, ‘ইন্ধন বহনকারিণী’ বলে তার চুগলী করার অভ্যাসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। চুগলখোরের জন্য ব্যবহূত এটি আরবীর একটি পরিভাষা। এই মেয়েটি কুরাইশদের নিকট গিয়ে মহানবী (সাঃ)-এর গীবত করত এবং তাদেরকে তাঁর প্রতি শত্রুতা করায় উসকানি দিত। (ফাতহুল বারী)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১১ : ৫ فِیۡ جِیۡدِهَا حَبۡلٌ مِّنۡ مَّسَدٍ ﴿۵﴾
তার গলায় পাকানো দড়ি। আল-বায়ান
আর (দুনিয়াতে তার বহনকৃত কাঠ-খড়ির পরিবর্তে জাহান্নামে) তার গলায় শক্ত পাকানো রশি বাঁধা থাকবে। তাইসিরুল
তার গলদেশে খেজুর বাকলের রজ্জু রয়েছে। মুজিবুর রহমান
Around her neck is a rope of [twisted] fiber. Sahih International
৫. তার গলায়(১) পাকানো রশি।(২)
(১) তার গলার জন্য “জীদ” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষায় গলাকে জীদ বলা হয়। পরবর্তীতে যে গলায় অলংকার পরানো হয়েছে তার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। [আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর] সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব বলেন, সে একটি অতি মূল্যবান হার গলায় পরতো এবং বলতো, লাত ও উযযার কসম, এ হার বিক্রি করে আমি এর মূল্য বাবদ পাওয়া সমস্ত অর্থ মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কাজ করার জন্য ব্যয় করবো। [ইবন কাসীর] এ কারনে জীদ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাঙ্গার্থে। অর্থাৎ এ অলংকার পরিহিত সুসজ্জিত গলায়, যেখানে পরিহিত হার নিয়ে সে গর্ব করে বেড়ায়, কিয়ামতের দিন সেখানে রশি বাধা হবে। [আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর]
(২) বলা হয়েছে, তার গলায় বাঁধা রশিটি ‘মাসাদ’ ধরনের। ‘মাসাদ’ এর অর্থ নির্ণয়ে কয়েকটি মত রয়েছে। তার একটি হচ্ছে, খুব মজবুত করে পাকানো রশিকে ‘মাসাদ’ বলা হয়। [বাগাবী] দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে, খেজুর গাছের (ডালের) ছাল/আঁশ থেকে তৈরি শক্ত পাকানো খসখসে রশি ‘মাসাদ’ নামে পরিচিত। [মুয়াস্সার] এর আরেকটি অর্থ, খেজুরের ডালের গোড়ার দিকের মোটা অংশ থেতলে যে সরু আশ পাওয়া যায় তা দিয়ে পাকানো রশি অথবা উটের চামড়া বা পশম দিয়ে তৈরি রশি। [কুরতুবী] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এর অর্থ লোহার তারের পাকানো রশি বা লোহার বেড়ি। কোন কোন মুফাসসির বলেন, তার গলায় আগুনের রশি পরানো হবে। তা তাকে তুলে আগুনের প্রান্তে উঠবে। আবার তাকে এর গর্তদেশে নিক্ষেপ করবে। এভাবে তার শাস্তি চলতে থাকবে। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
৫। তার গলদেশে খেজুর আঁশের পাকানো রশি। [1]
[1] جِيدٌ অর্থ হল গর্দান, ঘাড়। আর مَسَد অর্থ হল মজবুত রশি; চাহে তা কোন ঘাস অথবা খেজুরের আঁশ বা ছিলকার অথবা লোহার তার পাকানো হোক; যেমন এক এক মুফাসসির এর এক এক রকম অর্থ বর্ণনা করেছেন। কিছু উলামার মতে, সে দুনিয়াতে ঐ রশি নিজ ঘাড়ে বা গলদেশে ঝুলিয়ে রাখত। কিন্তু সবচেয়ে বেশী সঠিক বলে মনে হয় যে, জাহান্নামে তার গলায় যে বেড়ি হবে, তা হবে লোহার তারের পাকানো রশি। مَسَد শব্দ দ্বারা উপমা দিয়ে রশির
