আজকের আর্টিক্যাল এর মাধ্যমে আমরা গাজীপুর জেলা নিয়ে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করবো।
এক নজরে গাজীপুর জেলা
গাজীপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। অবস্থানগত কারণে এটি বাংলাদেশের একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত জেলা। ১৯৮৪ সালে এটি ঢাকা জেলা হতে পৃথক হয়ে গঠিত হয়। জেলাটি ঢাকা বিভাগে অবস্থিত, এর উত্তরে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ জেলা, দক্ষিণ-পূর্বে নরসিংদী জেলা পশ্চিমে টাঙ্গাইল জেলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে ঢাকা জেলা।
গাজীপুরের নামকরণ ও ইতিহাস
গাজীপুরের নামকরণ নিয়ে রয়েছে দুটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি-
- দিল্লীর সম্রাট মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে পালোয়ান গাজী নামে এক মুসলিম যোদ্ধা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। সময়ের পরিক্রমায় তার নাম থেকেই ‘গাজীপুর’ নামটির প্রচলন ঘটে।
- আরেকটি মত অনুযায়ী, সম্রাট আকবরের আমলে চব্বিশ পরগণার জমিদার ঈশা খাঁর অনুসারী ফজল গাজী ছিলেন ভাওয়াল রাজ্যের প্রথম ‘প্রধান’। ধারণা করা হয়, তার পদবী থেকেই ‘গাজীপুর’ নামটি এসেছে।
| ওয়েবসাইট | দাপ্তরিক ওয়েবসাইট |
পটভূমি
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন, যার আয়তন ৩৩০ বর্গকিলোমিটার (১৩০ বর্গমাইল)। বিশ্ব ইজতেমা টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক গাজীপুরে অবস্থিত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কারাগার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার গাজীপুরে অবস্থিত। গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইন্সটিটিউট অবস্থিত। এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানাও গাজীপুর জেলায় অবস্থিত।
অবস্থান ও আয়তন
গাজীপুর জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে ঢাকা জেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে কিশোরগঞ্জ জেলা ও নরসিংদী জেলা, পশ্চিমে ঢাকা জেলা ও টাঙ্গাইল জেলা।
প্রশাসনিক এলাকাসমূহ
গাজীপুর জেলা ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটির একটি সিটি কর্পোরেশন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন রয়েছে এবং নিম্নলিখিত উপজেলাগুলিতে বিভক্ত:
- গাজীপুর সদর উপজেলা
- কালিয়াকৈর উপজেলা
- শ্রীপুর উপজেলা
- কাপাসিয়া উপজেলা
- কালীগঞ্জ উপজেলা
ইতিহাস
গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালিগঞ্জ ও কাপাসিয়া এই ৫টি উপজেলা নিয়ে ঢাকা জেলা থেকে বিভক্ত হয়ে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ গাজীপুর জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালে গাজী নামে এক কুস্তিগির এখানে থাকতো আর তার নাম থেকেই সম্ভবত এই অঞ্চলের নাম হয়েছে গাজীপুর। আবার এই মতের বিরোধিতা করে অনেকে বলেন যে সম্রাট আকবরের সেনাপতি ঈশা খাঁর ছেলে ফজল গাজীর নামে এই জনপদের নামকরণ করা হয়েছে।
জনসংখ্যা
২০২২ সালের আদমশুমারির ফলাফল অনুসারে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ৮,৩৬,৮৭৫টি পরিবার রয়েছে এবং জনসংখ্যা ছিল ২৬,৭৭,৭১৫ জন। জনসংখ্যার ১৫.০০% ছিল ১০ বছরের কম বয়সী। গাজীপুরে ৭ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সাক্ষরতার হার ৮৩.৫৭% এবং লিঙ্গ অনুপাত ছিল প্রতি ১০০ জন মহিলার মধ্যে ১১২.৬১ জন পুরুষ।
| গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ধর্মসমূহ (২০২২) | ||
| ধর্ম | শতাংশ | |
| ইসলাম | ৯৫.৯১% | |
| হিন্দুধর্ম | ৩.৮৩% | |
| অন্য বা বিবৃত না | ০.২৬% | |
- নাফিসা আরেফীনজেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
- আহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়াউপপরিচালক, স্থানীয় সরকার
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের জনসংখ্যা ছিল ১৬,২৬,০৭৭ জন, যেখানে ৩৯৮,১৬৪টি পরিবার বাস করত। গাজীপুরের সাক্ষরতার হার ছিল ৬৭.৩৯% এবং লিঙ্গ অনুপাত ছিল প্রতি ১০০০ পুরুষে ৮৫৮ জন মহিলা।
স্বাস্থ্য
শহরে অনেক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিক রয়েছে। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ গাজীপুর শহরের অন্যতম বৃহৎ হাসপাতাল এবং শহরের একমাত্র সরকারি মেডিকেল কলেজ। শহরে ৩৬টি বেসরকারি ক্লিনিক এবং হাসপাতাল সহ দুটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজও রয়েছে। শহরে ২৬টি পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকও রয়েছে।
গাজীপুরে বায়ু দূষণের মাত্রা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ২০২০ সালে, গাজীপুরে বার্ষিক গড় PM২.৫ বায়ু দূষণ ছিল ৯৪.৬ μg/m3,যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রায় ১৮.৯ গুণ বেশি PM২.৫ নির্দেশিকা(5μg/m3: সেপ্টেম্বর, ২০২১ সালে সেট করা হয়েছে). এই দূষণের মাত্রা গাজীপুরে বসবাসকারী একজন মানুষের গড় আয়ু ৮.৮ বছর কমিয়ে দেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
শিক্ষা
গাজীপুরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রয়েছে বহুসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :-
বিশ্ববিদ্যালয়
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
- উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
- ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়
- ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি
কলেজ ও উচ্চবিদ্যালয়
- ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ
- টংগী সরকারি কলেজ
- গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ
- গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ
- রাণী বিলাসমনি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়
- কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ, গাজীপুর
দর্শনীয় স্থান
- ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
- গাজীপুর সাফারি পার্ক
- ভাওয়াল রাজবাড়ী, গাজীপুর সিটি
- নুহাশ পল্লী, গাজীপুর সদর
- কাশিমপুর জমিদার বাড়ি, গাজীপুর সদর
- আনসার একাডেমী, কালিয়াকৈর
- শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ী, কালিয়াকৈর
- বলিয়াদী জমিদার বাড়ী, কালিয়াকৈর
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
- মেঘনাদ সাহা- তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী।
- মোঃ সামসুল হক- স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি[৬]
- ফকির শাহাবুদ্দীন- বাংলাদেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল।
- তাজউদ্দিন আহমেদ- বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
- হুমায়ূন ফরীদি- জাতীয় চলচ্চিত্র ও একুশে পদক প্রাপ্ত অভিনেতা।
- ব্রিগেডিয়ারআ স ম হান্নান শাহ – রাজনীতিবিদ, সাবেক পাটমন্ত্রী।
- আহসানউল্লাহ মাস্টার- রাজনীতিবিদ; সাবেক সংসদ সদস্য।
- এম জাহিদ হাসান- পদার্থবিদ, ভাইল ফার্মিয়ন কণার আবিষ্কারক। ল ফার্মিয়ন কণার আবিষ্কারক।
- আবু জাফর শামসুদ্দীন- একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
- আর্চবিশপ পৌলিনুস ডি কস্তা- বাংলাদেশের প্রাক্তন সর্বোচ্চ ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতা।
- আ.ক.ম মোজাম্মেল হক- এমপি (গাজীপুর ১) এবং সাবেক মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
- জাহিদ আহসান রাসেল- এমপি গাজীপুর আসন নং ২ ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
- আনিছুর রহমান মিঞা- অবসরপ্রাপ্ত সচিব; চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
- মেহের আফরোজ চুমকি- রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য।
- সিমিন হোসেন রিমি- সাংসদ গাজীপুর আসন নং ৪।
- রহমত আলী- রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
- ইকবাল হোসেন সবুজ- সাংসদ গাজীপুর আসন নং ৩।
- মারাজ হোসেন অপি- খেলোয়াড়।
- জায়েদা খাতুন- মাননীয় মেয়র (নগর মাতা), গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
- চৌধুরী তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী- বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ।
- মোহাম্মদ ওবাইদ উল্লাহ- রাজনীতিবিদ; সাবেক সংসদ সদস্য।
- সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন- বাংলাদেশী মহিলা রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম।
- রুমানা আলী- রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য মহিলা আসন।
- ফকির আবদুল মান্নান শাহ- রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী।
- মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ (গাজীপুরের রাজনীতিবিদ) – বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য (সাবেক)।
- এ কে এম ফজলুল হক মিলন- রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য।
- মোহাম্মদ সানাউল্লাহ (চিকিৎসক) – সাবেক সংসদ সদস্য।
- এম. এ. মান্নান (গাজীপুরের রাজনীতিবিদ) – রাজনীতিবিদ এবংগাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী।
- মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরিচালনাকারী।
- জাহাঙ্গীর আলম- সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মেয়র, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
- হাসান উদ্দিন সরকার- সাবেক সাংসদ, গাজীপুর আসন নং ২।
- তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ- সাবেক প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
- মোঃ আতাবুল্লাহ- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক
- শাহ আবু নাইম মোমেনুর রহমান – সাবেক সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। “এক নজরে জেলা”। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ৩ মে ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুন ২০১৪। এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
- “জেলাগুলোর শ্রেণি হালনাগাদ করেছে সরকার”। বাংলানিউজ২৪। ১৭ আগস্ট ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২০।
- “গাজীপুর জেলা – বাংলাপিডিয়া”।banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২৪–১১–২১।
- বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। “জেলার পটভূমি”। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ২৬ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুন ২০১৪।
- “সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি”। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২।
