কলেজে ক্লাস চলছে। সদ্য যোগ দেওয়া একজন শিক্ষক ক্লাসরুমে ঢুকেই ছাত্রছাত্রীদের দিকে একবার নজর ঘোরালেন। সবার মধ্যে তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলেন নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরা একটি ছাত্রীকে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, “এই যে নীল জামা, তোমার নাম কী?”
মেয়েটি একটু দ্বিধা নিয়ে উত্তর দিল, “রেশমি, স্যার।”
শিক্ষক অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন, “তুমি এখনই ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও! ভবিষ্যতে কখনও যেন তোমার মুখ না দেখি আমি।”
সারা ক্লাস মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রেশমি হতবাক হয়ে বলল, “স্যার, আমি তো কোনো দোষ করিনি। তাহলে আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেন?”
শিক্ষক গর্জে উঠলেন, “আমি এক কথা দ্বিতীয়বার বলি না। চুপচাপ ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যাও।”
রেশমি আর কোনো কথা না বলে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিল এবং মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল ক্লাস থেকে। বাকি ছাত্রছাত্রীরা হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কেউ মুখ খুলল না।
এরপর শিক্ষক একটু থেমে গম্ভীর স্বরে বললেন, “বল তো, আইন কেন তৈরি করা হয়?”
একজন বলল, “সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য।”
আরেকজন বলল, “যাতে কেউ অন্যায়ের শিকার না হয়।”
তৃতীয়জন বলল, “রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস রাখার জন্য।”
চতুর্থজন বলল, “সবাই যেন ন্যায্য বিচার পায়।”
শিক্ষক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তোমরা ঠিক বলেছ।”
তারপর তিনি আবার বললেন,
“তোমাদের কি মনে হয় না কিছুক্ষণ আগে আমি রেশমির সাথে অন্যায় করেছি?”
সবাই চুপ, কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।
শিক্ষক কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বললেন, “হ্যাঁ, আমি রেশমির সঙ্গে স্পষ্টভাবে অবিচার করেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তোমরা কেউ কিছু বললে না কেন?”
তিনি পুরো ক্লাসে একবার চোখ বুলিয়ে নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব দিলেন, “কারণ তোমরা ভাবলে, এটা তো আমার সঙ্গে হয়নি! তাহলে আমি কেন কিছু বলব?”
শিক্ষক দৃঢ় স্বরে বলে চললেন, “এই মানসিকতাই একদিন তোমাদের বিপদের কারণ হবে। আজ যাকে নিঃশব্দে অবিচারের শিকার হতে দেখলে, আগামীকাল সেই অবস্থায় যদি তোমরাও পড়, সেদিনও কেউ তোমাদের পাশে দাঁড়াবে না।”
সারা ক্লাস নীরব, সবাই মাথা নিচু করে আছে। কেউ মুখ তুলে তাকাতে পারছে না।
শিক্ষক একটু বিরতি দিয়ে বললেন, “আজ তোমাদের এমন এক শিক্ষা দিলাম, যা তোমরা বছরের হাজারটা ক্লাস করেও হয়তো পেতে না। আজকের শিক্ষা জীবনের জন্য। সব সময় মনে রেখো, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে তুমিও সেই অন্যায়ের অংশীদার হয়ে যাও। চুপ থাকা মানেই সম্মতি দেওয়া। তাই যেখানেই অন্যায় দেখো — যার সঙ্গেই ঘটুক না কেন, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও।”
শিক্ষা: অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা মানেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। ন্যায়ের পথে থেকে সাহসের সাথে নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবধর্ম।
-বৈজয়ন্ত বিশ্বাস ভিক্টর
